ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি: দুই বছর ধরে নিখোঁজ থাকার পর পাবনার ঈশ্বরদী থেকে রুহুল আমিন (১৫) নামে এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবারের দাবি, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অজ্ঞাত মরদেহের ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।
নিহত রুহুল আমিন পাবনা সদর উপজেলার গাছপাড়া গ্রামের সাইদুল ইসলামের ছেলে। গত ১৪ আগস্ট রাতে ফেসবুকে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরের মরদেহের ছবি দেখে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। পরে চাচাতো ভাই মোহাম্মদ সজীব হোসেন ঈশ্বরদী থানা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করে মরদেহটি রুহুল আমিনের বলে নিশ্চিত করেন।
পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পারিবারিক বিভিন্ন কারণে অভিমান করে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় রুহুল আমিন। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঢাকা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনে তাকে খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে খবর পান, সে ঈশ্বরদী রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান করছে।
পরে পরিবারের সদস্যরা ঈশ্বরদী রেলস্টেশন থেকে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। তবে কিছুদিন পর আবারও পরিবারের অজান্তে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সে। এরপর ঈশ্বরদী রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকায় ছিন্নমূল ও মাদকাসক্ত কিশোরদের সঙ্গে মিশে ড্যান্ডি ও অন্যান্য নেশায় জড়িয়ে পড়ে বলে পরিবারের দাবি। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও দীর্ঘদিন তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশাদুর রহমান আসাদ জানান, অসুস্থ অবস্থায় স্থানীয় এক ব্যক্তি রুহুল আমিনকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। হাসপাতাল থেকে খবর পাওয়ার পর পুলিশ মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে। তবে তখন পর্যন্ত পরিবারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ওসি বলেন, মরদেহ শনাক্তের জন্য পুলিশ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে ছবি প্রচার করা হয়। পরে ‘আঞ্জুমানে মফিদুল’কে মরদেহ হস্তান্তরের প্রস্তুতির সময় পরিবারের একজন সদস্য যোগাযোগ করেন। ফেসবুকে প্রচারিত ছবি দেখে তারা মরদেহটি রুহুল আমিনের বলে শনাক্ত করেন। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
চিকিৎসকদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে তার শরীরে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়েছিল। কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং লিভারে পানি জমার মতো জটিলতায় তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে জানা গেছে।
আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১৬ আগস্ট দুপুর আড়াইটার দিকে জানাজা শেষে রুহুল আমিনকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ঈশ্বরদীতে দীর্ঘদিন ধরে ছিন্নমূল শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তাদের অনেকেই বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায় থানা পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশকে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব শিশুর বয়স সাধারণত ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে হওয়ায় তাদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু জটিলতা রয়েছে। তারপরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ঈশ্বরদী রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকায় কিশোরদের মধ্যে ড্যান্ডিসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রুহুল আমিনের মতো আর কোনো কিশোর যেন মাদকের কারণে অকালে প্রাণ না হারায়, সে জন্য প্রশাসন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক ও সমাজের সবাইকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.