বাংলাদেশে গ্রাম্য সালিশে ফৌজদারি অপরাধ বিচারের আইনি ভিত্তি হলো ⁠গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬। ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ ও ফৌজদারি অপরাধের দ্রুত ও সহজ নিষ্পত্তির জন্য এই আইনটির অধীনে ‘গ্রাম আদালত’ গঠন করা হয়।

বিচারযোগ্য ফৌজদারি অপরাধসমূহ:
এই আইনের তফসিল অনুযায়ী, গ্রাম আদালত কেবল নির্দিষ্ট কিছু ছোটখাটো ফৌজদারি অপরাধের বিচার করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
★দণ্ডবিধির অধীনে বেআইনি জনসমাবেশ (ধারা ১৪৩ ও ১৪৭)।
★ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ আঘাত দেওয়া (ধারা ৩২৩)।
★সম্পত্তি বিনষ্ট বা ক্ষতিসাধন (ধারা ৪২৬ ও ৪৪৭)।
★চুরি, প্রতারণা বা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের কারণে সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা মূল্যের সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ।
গ্রাম আদালতের গঠন:
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বাদী ও বিবাদী পক্ষের মনোনীত ২ জন করে মোট ৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়।

আইনের সীমাবদ্ধতা:
★কোনো ব্যক্তি যদি এর আগে কোনো ফৌজদারি আদালতে দণ্ডিত হয়ে থাকেন, তবে সেই ব্যক্তির বিচার গ্রাম আদালতে করা যায় না।
★গ্রাম আদালত সর্বোচ্চ ৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা এই আদালতের নেই।

আপিল বা পুনর্বিবেচনা:
গ্রাম আদালতের রায়ে কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে উপযুক্ত আদালতে (ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে) আপিল দায়ের করার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী গ্রাম্য মাতব্বর বা মোড়লদের নিয়ে গঠিত সালিশ কোনো ফৌজদারি অপরাধের বিচার করতে আইনত ক্ষমতাপ্রাপ্ত নয়। কোনো অপরাধের বিচার করতে হলে তা অবশ্যই আইনানুগ গ্রাম আদালতের কাঠামোর অধীনে হতে হবে।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো গ্রামের মোড়ল বা মাতব্বর এককভাবে বা সালিশি সভার মাধ্যমে কোনো ফৌজদারি অপরাধের বিচার করতে পারেন না। এ ধরনের কাজ আইনত অবৈধ এবং বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয়। গ্রামের মোড়ল যদি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার করেন, তবে তাকে নিচের শাস্তিগুলোর সম্মুখীন হতে হতে পারে:
১.বিচারবহির্ভূত শাস্তির অপরাধে মামলাঃ
যদি সালিশের নামে কাউকে শারীরিক নির্যাতন (যেমন: মারধর, কান ধরে উঠবস করানো বা দোররা মারা) করা হয়, তবে তা ফৌজদারি অপরাধ। এক্ষেত্রে দণ্ডবিধি (Penal Code), ১৮৬০ এর অধীনে:সাধারণ আঘাতের জন্য (ধারা ৩২৩): সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা ১,০০০ টাকা জরিমানা।
গুরুতর আঘাতের জন্য (ধারা ৩২৫): সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।
অবৈধভাবে আটকে রাখা (ধারা ৩৪১/৩৪২): কাউকে জোর করে সালিশে বসিয়ে রাখলে ১ মাস থেকে ১ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
২.মানহানি ও অপমানের শাস্তিঃ
সালিশে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করলে বা অপবাদ দিলে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মোড়লের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা যায়। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড।
৩.আদালত অবমাননা ও সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহারঃ
গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী কেবল নির্ধারিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত আদালতই নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের বিচার করতে পারে। এর বাইরে কোনো মোড়ল যদি নিজেকে বিচারক হিসেবে জাহির করেন, তবে তা ছদ্মবেশ ধারণ (Personating) বা সরকারি কর্মচারীর ক্ষমতা অপব্যবহারের অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে (ধারা ১৭০/১৭১)।
৪.বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে (যেমন: ফতোয়া বা সালিশের নামে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধকরণ) স্পষ্ট জানিয়েছে যে, গ্রাম্য সালিশে কাউকেই শারীরিক বা অপমানজনক শাস্তি দেওয়া যাবে না। কোনো মোড়ল এই নির্দেশনা অমান্য করলে তাকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করা যায়।
প্রতিকার:
যদি কোনো মোড়ল অবৈধভাবে সালিশ ডেকে বিচার করেন বা শাস্তি দেন, তবে ভুক্তভোগী সরাসরি নিকটস্থ থানায় মামলা করতে পারেন অথবা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা (C.R. Case) দায়ের করতে পারেন।

লেখক-
মোঃ নাছিম রানা
এলএলবি, এলএলএম(প্রথম বিভাগ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আইনজীবী, জেলা ও দায়রাজজ আদালত ঢাকা।