সুজন আহম্মেদ, ভাঙ্গুড়া: পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বেসরকারি হাসপাতালে সন্তান প্রসবের পর একই দিনে দুই নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন স্বজনরা। তাঁদের দাবি, সময়মতো চিকিৎসক না পাওয়া, সিজারিয়ান অপারেশনে বিলম্ব এবং যথাযথ চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় নবজাতক দুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) উপজেলার শরৎনগরে অবস্থিত ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড হাসপাতালে এ দুটি ঘটনা ঘটে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতালটির পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার বলেছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ম অনুযায়ী স্বাভাবিক প্রসব ও সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছে।
দুটি পরিবারই সন্তান জন্মের অপেক্ষায় ছিল নতুন অতিথিকে বরণ করে নেওয়ার আনন্দে। কিন্তু নবজাতকদের মৃত্যুর পর সেই আনন্দ রূপ নেয় শোকে। স্বজনদের অভিযোগ, প্রসবকালীন জটিলতার সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়নি। একই দিনে একই হাসপাতালে দুটি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চিকিৎসকের অপেক্ষায় চার ঘণ্টা, পরে মৃত ঘোষণা প্রথম ঘটনাটি ঘটে উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মাসুদ রানা (৪০) ও তাঁর স্ত্রী অন্তরা খাতুনের (২৫) ক্ষেত্রে। প্রায় দুই বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়। অন্তরা প্রায় ১০ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গত শনিবার ভোরে তাঁর প্রসবব্যথা শুরু হলে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁকে নাজিম উদ্দিন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সেখানে আলট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মা ও গর্ভের সন্তান সুস্থ আছেন বলে জানানো হয়। তবে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য চিকিৎসক না থাকায় দেরি হবে জানানো হলে সকাল ১০টার দিকে অন্তরাকে শরৎনগরের ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের কথা জানালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসক বাইরে আছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে চলে আসবেন বলে জানান। ততক্ষণ স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করতে বলা হয়। এভাবে প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর নার্সের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব করানো হয় বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।
তাঁদের ভাষ্য, সন্তান জন্মের পর নবজাতকের কোনো সাড়া না পেয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে শিশুটিকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান তাঁরা। সেখানে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক উম্মে হুরাইরা নবজাতককে মৃত ঘোষণা করেন।
সন্তান হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা অন্তরা খাতুন। তাঁর অভিযোগ, সময়মতো চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেলে হয়তো সন্তানকে হারাতে হতো না। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
নবজাতকের চাচা কামাল হোসেন বলেন, প্রসবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চিকিৎসক না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
চিকিৎসক উম্মে হুরাইরা নবজাতকটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দ্বিতীয় নবজাতকের মৃত্যু পাবনায় নেওয়ার পথে একই দিনে ভাঙ্গুড়া উপজেলার চৌবাড়িয়া দক্ষিণপাড়ার তারেক আলীর স্ত্রী মুসলিমা আক্তার মনাকেও ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রসবব্যথা নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, ভর্তির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর শরীরে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানালে তাঁরা দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করেন। এরপরও সিজারিয়ান অপারেশনের চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় অপেক্ষা করতে হয়। চিকিৎসক কিছুক্ষণের মধ্যে আসবেন বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রায় তিন ঘণ্টা পার হয়ে যায় বলে দাবি তাঁদের।
পরে চিকিৎসক এসে অস্ত্রোপচার করেন। তবে নবজাতকের অবস্থা ভালো না থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পথে শিশুটির মৃত্যু হয় বলে জানান স্বজনরা।
দ্বিতীয় নবজাতকের চাচা মাসুদ অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভর্তির পর রক্তের ব্যবস্থা করেও সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়নি। দীর্ঘ সময় চিকিৎসকের অপেক্ষার পর অস্ত্রোপচার করা হলেও শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেন তিনি।
দায় অস্বীকার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার বলেন, তাঁদের হাসপাতালে নিয়ম অনুযায়ী স্বাভাবিক প্রসব ও সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছে। তিনি হাসপাতালের দায় অস্বীকার করেন।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হালিমা খানম বলেন, রোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাবনার সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ বিষয়ে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। প্রতিবেদকের কাছ থেকেই প্রথম বিষয়টি জেনেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
প্রসবকালীন জটিলতায় মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় সময়মতো চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এবং জরুরি নবজাতকসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই দিনে একই হাসপাতালে দুই নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের উপস্থিতি, চিকিৎসা দিতে বিলম্বের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার নথি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। তবে নবজাতক দুটির মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.