- পাসের হার কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট, জিপিএ-৫ হারিয়েছে প্রায় ২৬ হাজার
রাজশাহীপ্রতিবেদক: রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনমন ঘটেছে। গত সাত বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে এই বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬১৩ জনে।
শুধু পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ নয়, শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাতেও এবার বড় পতন হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের ফলাফল রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে দুর্বল ফলাফলের চিত্র তুলে ধরেছে।
এক বছরেই পাসের হারে বড় পতন
২০২৫ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে তা কমে হয়েছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হার কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
এর আগে ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৮৭ দশমিক ৮৯, ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৮৮, ২০২১ সালে ৯৪ দশমিক ৭১ এবং ২০২০ সালে ৯০ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল।
অর্থাৎ সাত বছরের ব্যবধানে পাসের হারে যে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, ২০২৬ সালে তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে।
জিপিএ-৫ থেকে ছিটকে পড়েছে হাজারো শিক্ষার্থী
পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও বড় ধস নেমেছে। ২০২২ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে ৪২ হাজার ৫২৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। সাত বছরের পরিসংখ্যানে এটিই ছিল অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যা।
২০২৩ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৮৭৭ জনে। ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে হয় ২৮ হাজার ৭৪ জন। এরপর ২০২৫ সালে তা আরও কমে ২২ হাজার ৩২৭ জন এবং ২০২৬ সালে মাত্র ১৬ হাজার ৬১৩ জনে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ২৫ হাজার ৯০০ জন।
মেয়েরা এবারও ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে
ফলাফলের লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণেও মেয়েদের এগিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালে মেয়েদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিপরীতে ছেলেদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
গত বছরও একই চিত্র ছিল। ২০২৫ সালে মেয়েদের পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ০১ শতাংশ এবং ছেলেদের ৭৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের অবস্থান এগিয়ে। এবার জিপিএ-৫ পাওয়া ১৬ হাজার ৬১৩ জনের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯১ জন ছাত্রী এবং ৭ হাজার ৬২২ জন ছাত্র।
শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠানে ধস
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলেও এবারের চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের মাত্র ৩৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
অথচ ২০২৫ সালে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯৯টি। ২০২৪ সালে ছিল ২৮৯টি। এর আগে ২০২৩ সালে ১৭৮টি, ২০২২ সালে ১৪৭টি, ২০২১ সালে ৩৯৮টি এবং ২০২০ সালে ৩০৮টি প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাস করেছিল।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৪টি কমেছে।
এবার পাঁচ প্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ
ফলাফলের নিচের দিকের চিত্রও এবার সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
এ ছাড়া ১ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১টি। অথচ ২০২৫ সালে শূন্য শতাংশ কিংবা ১ থেকে ৫০ শতাংশ পাসের এমন প্রতিষ্ঠান ছিল না।
পরীক্ষার্থীও কমেছে
২০২৬ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার। পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার। অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৯০৮ জন।
২০২৫ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার। উপস্থিত ছিল প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার এবং অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৪৮২ জন।
এর আগের বছরগুলোতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল আরও বেশি। ২০২৪ সালে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার, ২০২৩ সালে ২ লাখ ৬ হাজারের বেশি, ২০২২ সালে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার, ২০২১ সালে ২ লাখ ৮ হাজারের বেশি এবং ২০২০ সালে ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
কেন এমন ফল, প্রশ্ন উঠছে শিক্ষার মান নিয়ে
সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এসএসসির ফলাফলে ধারাবাহিক অবনমন ঘটছে। ২০২১ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে।
একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ২০২২ সালের ৪২ হাজার ৫২৭ থেকে কমে ২০২৬ সালে ১৬ হাজার ৬১৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
ফলে এবারের ফলাফল শুধু একটি বছরের ফলাফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পাসের হার, জিপিএ-৫ এবং শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান মিলিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার সামগ্রিক মান ও ফলাফলের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে ফলাফলের এই পতনের পেছনে সিলেবাস, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানসহ কোন বিষয় কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.