সুজন আহম্মেদ| ভাঙ্গুড়া: পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার গুমানী নদীর ওপর সেতু না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চরভাঙ্গুড়া খাপাড়া ও সরকারপাড়াসহ আশপাশের ৩০ থেকে ৪০টি গ্রামের মানুষ। নদী পারাপারে তাঁদের একমাত্র ভরসা ছোট ডিঙি নৌকা। এতে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী ও সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘদিনের এ দুর্ভোগ লাঘবে নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চরভাঙ্গুড়া খাপাড়া ও সরকারপাড়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে গুমানী নদী। নদীর দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেতুর অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। সরকারপাড়ায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকায় শিশুদের প্রতিদিন নৌকায় নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুম ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় এ যাতায়াত আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন অভিভাবকেরা।

নদীর ওপারে রয়েছে খাপাড়া এলাকার অনেক কৃষিজমি। ফসল কাটার মৌসুমে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাড়িতে আনা এবং হাটবাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষকদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। নৌকায় ফসল পরিবহনে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফসল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, গুমানী নদীর চরভাঙ্গুড়া খাপাড়া ও সরকারপাড়া অংশে একটি সেতু নির্মাণ করা হলে আশপাশের ৩০ থেকে ৪০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে নৌবাড়ীয়া ব্রিজ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়। ওই স্থানে সেতু নির্মিত হলে প্রায় পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার পথ কমে আসবে বলে দাবি তাঁদের। এতে সময় ও যাতায়াত ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীদের। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নৌকা না পাওয়া গেলে নদী পারাপার কঠিন হয়ে পড়ে। অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের উপজেলা সদরে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হয় সমস্যা। স্থানীয়দের মতে, সেতু নির্মিত হলে এসব দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।

এলাকাবাসীর উল্লেখ করা গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারপাড়া, মাগুড়া, চকলক্ষিকোল, পুইবিল, পাটুল, পাছ পাটুল, তারাপুর, বাঁশুরিয়া, পাঁচবেতুয়ান, কাজিটোল, চাচকিয়া, দিলপাশার, আগবহর ও পাঁচবহরসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রাম।

সেতু নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের-

ভাঙ্গুড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল মতিন রাজু বলেন, “চরভাঙ্গুড়া ঘাট একটি ঐতিহ্যবাহী পুরোনো ঘাট। এখানে একটি সেতু নির্মাণ সাধারণ মানুষের জন্য খুবই জরুরি। ফসলের মৌসুমে কৃষকদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। পাশাপাশি শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও অনেক সুবিধা হবে।”

তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর নদী পারাপারের ব্যবস্থা না থাকলে মানুষকে চরম সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীদের জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা সদরে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সেতু নির্মাণ করা হলে হাসপাতাল, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দ্রুত যাতায়াত সম্ভব হবে।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান লিটন বলেন, সেতু না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বিকল্প পথে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। এতে সময় ও যাতায়াত ব্যয় বাড়ে। সেতু নির্মিত হলে মানুষের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে গিয়ে মানুষের সময় ও শ্রম নষ্ট হয়। সেতু নির্মাণ করা হলে শিক্ষার্থী, কৃষক ও কর্মজীবী মানুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ উপকৃত হবেন।

সাবেক ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক সায়েম সরকার বলেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাতায়াতের কারণে মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটে। সেতু নির্মিত হলে যাতায়াত সহজ হবে এবং শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের সময় সাশ্রয় হবে।

হাজী জামাল উদ্দিন সরকারি ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক বাইজিদ বোস্তমী বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলে শিক্ষার্থীরা সহজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে পারবেন। পাশাপাশি শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের সময় ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।

কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ডাবলু সরকার বলেন, সেতু নির্মাণ হলে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের সময় কমবে। এতে কর্মজীবীদের কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে এবং এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।

এলাকার ইউপি সদস্য আবু সাইদ বলেন, দীর্ঘ ও বিকল্প পথে যাতায়াতের কারণে মানুষকে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়। জনস্বার্থে এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি-

সেতু নির্মাণের বিষয়ে জানতে ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রস্তাবিত স্থানে সেতু নির্মাণের সম্ভাবনা, প্রকল্প গ্রহণ কিংবা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা সম্পর্কে বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে গুমানী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, জনস্বার্থ, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।