এনামুল হক:

দাখিল পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রতিবছরই আলোচনা হয়। মাদরাসাগুলোর ফলাফল তুলনামূলকভাবে খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে নানা বিষয় সামনে আসে। কিন্তু সমস্যাটিকে শুধু দাখিল পর্যায়ের কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এর প্রকৃত কারণগুলো আড়ালেই থেকে যায়। মাদরাসার ফল বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে শিক্ষার একেবারে প্রাথমিক স্তর—এবতেদায়ীর দিকে।

মাদরাসার প্রাথমিক স্তরকে (১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত) বলা হয় এবতেদায়ী। এবতেদায়ী সেকশন এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্যটি এখন বেশ স্পষ্ট। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। বিপরীতে এবতেদায়ী মাদরাসা এবং সংযুক্ত দাখিল-আলিম মাদরাসাগুলোর জন্য তেমন কিছুই করা হয়নি।

এবতেদায়ী শিক্ষার্থীরা কোনো উপবৃত্তিও পায় না, টিফিনও পায় না। গ্রামাঞ্চলের অস্বচ্ছল অভিভাবকদের একটি বড় অংশ উপবৃত্তির জন্যও বাচ্চাদের মাদরাসায় না পড়িয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান। ফলে এবতেদায়ী পর্যায়ে মাদরাসাগুলো শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। অধিকাংশ মাদরাসায় পরীক্ষার ফি ছাড়া অন্যান্য ফি বা মাসিক বেতন নেওয়া হয় না। ফলে অনেক অভিভাবক একই বাচ্চাকে পরবর্তী সময়ে দাখিল পর্যায়ে মাদরাসায় ভর্তি করান। কিন্তু তখন দেখা যায়, শিক্ষার্থীর প্রাথমিক ভিত্তিই যথেষ্ট শক্ত নয়।

জেনারেল সাবজেক্টগুলো—বাংলা, গণিত ও ইংরেজি—উভয় বিদ্যালয়েই প্রায় একই হলেও মাদরাসার জন্য আরবি ভাষা ও সাহিত্য একটি অপরিহার্য বিষয়। অথচ দাখিল পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা আরবি হরফও ভালো করে জানে না। এবতেদায়ী পর্যায়েই তাদের আরবিতে রচনা, দরখাস্ত, সংলাপ এবং আরবি ব্যাকরণের প্রাথমিক বিষয় জানার জন্য সুনির্দিষ্ট সিলেবাস রয়েছে। কিন্তু সেই সিলেবাস অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এবতেদায়ী থেকে দাখিল পর্যন্ত আরবি শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় গ্যাপ তৈরি হচ্ছে।

এবতেদায়ী পঞ্চম শ্রেণি কিংবা দাখিল ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে কওমি মাদরাসা থেকে এসে যে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়, তাদের অধিকাংশই বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে অনেক দুর্বলতা নিয়ে আসে। তাছাড়া কওমি বা হেফজ মাদরাসায় যে সিলেবাসে আরবি পড়ানো হয়, সেটির সঙ্গে আলিয়া মাদরাসার সিলেবাসে রয়েছে অনেক তফাৎ। এই গ্যাপটাও জটিলভাবে থেকেই যায়, যথাযথভাবে পূরণ হয় না।

এবতেদায়ী সেকশনে অধিকাংশ মাদরাসায় ক্বারী শিক্ষক নেই। এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হলেও ক্বারী শিক্ষক সংকটের একটি বড় কারণ হলো, দাখিল-আলিম পর্যায়ে মুজাব্বিদ বিভাগ থেকে পাশ করা তেমন শিক্ষার্থীই নেই। প্রতি জেলা থেকে গড়ে যে ৫-১০ জন মুজাব্বিদ বিভাগ থেকে পাশ করে, তারা শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতেই টিকতে পারে না; সমগ্র দেশে হয়তো দু-চারজন পাশ করে। ফলাফল, এবতেদায়ী ও দাখিল—দুই শাখাতেই ক্বারী শিক্ষক নেই। এই গ্যাপ অনেক পুরোনো।

নিয়োগ-সংক্রান্ত নতুন বিধিমালায় অবশ্য কওমি মাদরাসা থেকে উত্তীর্ণদের জন্য সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তারা বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞান অংশের প্রিলিমিনারিটি উৎরে আসতে পারবে কি না, সেখানেও সন্দেহ রয়েছে। অর্থাৎ ক্বারী শিক্ষক সংকটের সমাধান শুধু নিয়োগের সুযোগ তৈরি করলেই হবে না; যোগ্য প্রার্থী তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদটি যতটা আকর্ষণীয়, ঠিক ততটাই অবহেলিত ‘এবতেদায়ী প্রধান শিক্ষক’ পদ। ‘এবতেদায়ী প্রধান’ পদে কোনো নিবন্ধন নেই, তেমন বেতনও নেই। আর নিয়োগের ভার দেওয়া আছে ম্যানেজিং বা গভর্নিং বডি নামক কমিটির ওপর। কমিটি উৎকোচ দাবি করে বলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে এবতেদায়ী প্রধান পদটি বছরের পর বছর ধরে ফাঁকা পড়ে আছে।

এবতেদায়ী পর্যায়ে নিবন্ধনে পাশ করে আসা জুনিয়র শিক্ষক, জুনিয়র মৌলভী পদে কর্মরত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা একদম সীমিত হওয়ায় অন্য একটি চাকরির জন্য চাকরির বয়স শেষ না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন এসব শিক্ষক। ফলাফল, শিক্ষক সংকট। অধিকাংশ মাদরাসায় খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এবতেদায়ী পর্যায়ে পাঠদানের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুই থেকে তিনজন।

সংযুক্ত মাদরাসাগুলো—অর্থাৎ যে মাদরাসায় এবতেদায়ী, দাখিল কিংবা আলিম-ফাজিল একসঙ্গে রয়েছে—সেসব মাদরাসার দাখিল কিংবা আলিম-ফাজিল পর্যায়ের শিক্ষকদের দ্বারা এবতেদায়ী পর্যায়ে ক্লাস নেওয়ানো হয়। নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক না হওয়ায় অনেক শিক্ষক দায় এড়ানোর মতো করে এবতেদায়ী শ্রেণিতে ক্লাস নেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাবও দেখা যায়।

আমি যে মাদরাসা থেকে দাখিল-আলিম পাশ করেছিলাম, এখন সেই মাদরাসাতেই এবতেদায়ী মৌলভী হিসেবে শিক্ষকতা করছি। ২০০৭ সালে আমি এবতেদায়ী পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েছি। তখন আমরা আরবি ব্যাকরণের বেশ কিছু বেসিক বিষয় পড়েছি। ‘মিজান’ ও ‘মুনশাইব’ নামক বইটি—অর্থাৎ আরবি ব্যাকরণের ছরফ অংশ—প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। ক্লাস সিক্স-সেভেনে আমরা তাহকিক-তারকিবেও যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে উঠেছিলাম।

অথচ এখন ক্লাস নাইন-টেনের মাদরাসা শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই এগুলো জানে না। দাখিল পরীক্ষা-২০২৬-এ ফেল করা শিক্ষার্থীদের একটি বৃহৎ অংশ ‘আরবি’ বিষয়ে ফেল করেছে। এটি শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; বরং আরবি শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের ঘাটতির একটি প্রতিফলন।

মাদরাসার শিক্ষার্থীরা কোন কোন বিষয়ে বেশি ফেল করেছে? শুধু আরবিতেই নয়, ইংরেজি, গণিত ও রসায়ন বিষয়েও গড়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে। কিছু শিক্ষার্থী থাকে, যারা কওমিতে নিয়মিত পড়াশোনা করে অথচ আলিয়া মাদরাসায় নামমাত্র ভর্তি আছে। শুধু ফাইনাল পরীক্ষায় এসে অংশগ্রহণ করে।

মাদরাসাগুলো এমনটা কেন করে? কারণ, তাদের শিক্ষার্থী সংকট। যথাযথ মূল্যায়ন না করেই তাদের পরীক্ষার হলে পাঠালে রেজাল্টের বেহাল দশা ছাড়া আর কী-ই বা দেখা যাবে! শিক্ষার্থী ধরে রাখার স্বার্থে যখন নিয়মিত পাঠদান ও মূল্যায়নের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীকেও পরীক্ষায় পাঠানো হয়, তখন ফলাফল খারাপ হওয়ার দায় শুধু শিক্ষার্থীর ওপর দেওয়া যায় না।

আমাদের প্রত্যন্ত এলাকার অস্বচ্ছল অভিভাবকদের বিপুল একটা অংশ মনে করেন, কওমি ও আলিয়া মাদরাসার আরবি একই রকম। ‘কওমিতে যেহেতু পড়েছে, সুতরাং আরবি পারে’—এমন ধারণা থেকে অভিভাবকদের বেরিয়ে আসা জরুরি। আবার যত্রতত্র কওমি মাদরাসা গজিয়ে ওঠার কারণে যারা এবতেদায়ী মাদরাসায় পড়ার কথা, তারা কওমিতে পড়ছে। পরবর্তীতে এদের বৃহৎ একটি অংশ দুকূল হারায়—কওমি ধারার শিক্ষায় আলিয়ার পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি তৈরি হয় না, আবার আলিয়া ধারায়ও এসে তাদের আগের শিক্ষাগত ঘাটতি যথাযথভাবে পূরণ করা হয় না।

রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়েও ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে মাদরাসাগুলোতে বিজ্ঞানাগারের অভাব একটি বড় কারণ। যথাযথ ল্যাবরেটরি না থাকা এবং হাতে-কলমে বা প্র্যাকটিক্যালি না শিখে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার কারণে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ বিষয়গুলোর মৌলিক ধারণা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে পরীক্ষায় তারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারছে না।

দীর্ঘ গ্যাপ থাকায় শিক্ষার্থীরা অমনোযোগী হয়ে যায়, ক্লাস তাদের ভালো লাগে না। প্রতিদিনের পড়া না পারার ব্যর্থতায় তারা ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, অসৎসঙ্গে মিশে যাবার প্রবণতা বেড়ে যায়। মোবাইল ফোনের দিকে আকৃষ্ট হয়ে প্রযুক্তির মিস ইউজ করতে থাকে। এমনকি কিছু শিক্ষার্থী মাদক, জুয়া, কিশোর গ্যাং, হানি-ট্র্যাপের মতো ভয়াবহ অসামাজিক কার্যকলাপেও লিপ্ত হয়ে যায়। এটা জাতির জন্য অশনিসংকেত।

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়ে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়—প্রথমত, নিয়মিত আলিয়া মাদরাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর স্বল্পতা। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য সামগ্রিক উন্নয়নমূলক শিখনের অভাব। তৃতীয়ত, এবতেদায়ী পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধার অভাব। চতুর্থত, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষক সংকট। পঞ্চমত, অভিজ্ঞ শিক্ষক ধরে রাখার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কওমি ও আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রমগত পার্থক্য এবং সেই পার্থক্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সেতুবন্ধনমূলক শিক্ষার অনুপস্থিতি।

তাই মাদরাসার ফল বিপর্যয়কে শুধু দাখিল পরীক্ষার ফলাফল হিসেবে দেখলে চলবে না। এর শিকড় অনেক গভীরে। ফলাফল ভালো করতে হলে প্রথমে এবতেদায়ী স্তরকে শক্তিশালী করতে হবে। পর্যাপ্ত ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, এবতেদায়ী প্রধান পদকে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করা, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্বারী শিক্ষক সংকট দূর করা, কওমি থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য সেতুবন্ধনমূলক শিক্ষা চালু করা, বিজ্ঞানাগার ও ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা এবং নিয়মিত শিক্ষার্থী ছাড়া নামমাত্র ভর্তি ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি।

দাখিলের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে হলে দাখিল পরীক্ষার কয়েক মাস আগে নয়, বরং এবতেদায়ী প্রথম শ্রেণি থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষার্থীর দাখিলের ফলাফল আসলে তার দশ বছরের শিক্ষাজীবনের ফলাফল। এবতেদায়ী স্তর দুর্বল রেখে দাখিলের ফল ভালো করার চেষ্টা অনেকটা শিকড় দুর্বল রেখে গাছের ফলন বাড়ানোর চেষ্টার মতো।

এনামুল হক
এবতেদায়ী মৌলভী,
হোগলবাড়ীয়া আলিম মাদরাসা, চাটমোহর, পাবনা।

(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়)